৯ম-১০ম শ্রেণির ব্যাকরণ বইয়ের মুদ্রণজনিত ভুল পর্ব-২

ইতোমধ্যে ১ম পর্বে আমরা ৯ম-১০ম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত মুদ্রণজনিত ভুল নিয়ে আলোচনা করেছি। ধারাবাহিকভাবে আজ আমরা বইটির অন্যান্য প্রচলিত ভুলগুলো নিয়ে আলোচনা করব। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় সমাস।

আরাও পড়ুনঃ ব্যাকরণ বইয়ের মুদ্রণজনিত ভুল পর্ব-১ ।৯ম-১০ম শ্রেণির ব্যাকরণ বইতে সমাস সম্পর্কিত যত মুদ্রণজনিত ভুল আছে নিম্নে তা নিয়ে আলোচনা করা হলো –

৯ম-১০ম শ্রেণির ব্যাকরণ বইয়ের মুদ্রণজনিত ভুল পর্ব-২

দোতলা : এটা পৃ. ৬৩ এ সাধারণ কর্মধারয়ে এবং পৃ. ৬৮ এ প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহিতে দেওয়া আছে। একটু চিন্তা করেন, আপনাকে যদি বলি আমি দোতলায় আছি। আপনি কি আমাকে খুঁজতে একতলায় বা তিনতলায় যাবেন? না। আপনি দোতলায়ই আসবেন। লক্ষ্য করুন, ইংরেজিতে 1st Floor মানে দোতলা, 2nd Floor মানে তিন তলা, 3rd Floor মানে চার তলা। কারণ Ground Floor মানে নিচতলা।

কিন্তু বাংলায় নিচতলা আর একতলা একই জিনিস। দোতলা মানে ২য় তলাই, চৌতলা মানে ৪র্থ তলাই অর্থাৎ পরপদ প্রধান। এখন আমরা জানি বহুব্রীহি সমাস অন্যপদ প্রধান আর তৎপুরুষ, কর্মধারয় ও দ্বিগু পরপদ প্রধান। তার মানে ‘দোতলা’ যেহেতু পরপদ প্রধান তাহলে এটা তৎপুরুষ, কর্মধারয় বা দ্বিগু সমাসের মধ্যে কোনোটির অন্তর্ভুক্ত হবে।

যেহেতু সংখ্যা দিয়ে সমস্তপদের শুরু হয়েছে সেহেতু ‘দোতলা’কে আমরা দ্বিগু সমাস বলব। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে বইতে কি তাহলে কর্মধারয়ে যে ‘দোতলা’ দেওয়া আছে তা ভুল? না। কারণ অনেক ব্যাকরণবিদ দ্বিগু সমাসকে কর্মধারয়ের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাই আমরা পরীক্ষায় ‘দোতলা’ আসলে প্রাথমিকভাবে দ্বিগু উত্তর করব আর অপশনে না থাকলে কর্মধারয় দিব।

তেমাথা : পৃ. ৬৯ এ এই সমাসটি দ্বিগুতে দেওয়া আছে। ভালোভাবে চিন্তা করেন তেমাথা দিয়ে কী / কাকে বুঝায়? আপনি বলতে পারেন যার তিন মাথা আছে তাকে বুঝায়। আপনার কথা ঠিক। তাহলে এবার বলেন তিন মাথা আছে কার? এবার আপনি বলতে পারেন তিনটা রাস্তার মিলনস্থলকে তেমাথা বলে।

যদি তাই হতো তাহলে চার রাস্তার মিলনস্থলকে চৌমাথা না বলে চৌরাস্তা বলেন কেন? এখানেই লুকিয়ে আছে উত্তর। আসলে ‘তেমাথা’ বলতে বুঝানো হয় বয়সের ভারে কুজো হয়ে যাওয়া ব্যক্তিটিকে যার মাথা দুই হাটুর মাঝখানে চলে আসছে। অর্থাৎ অন্যপদ প্রধান সুতরাং ‘তেমাথা’কে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি বলাটাই শ্রেয়।

বোটাখসা : এটা পৃ. ৬৫ এ পঞ্চমী তৎপুরুষে এবং পৃ. ৬৭ এ ব্যাধিকরণ বহুব্রীহিতে দেওয়া আছে। আমরা জানি তৎপুরুষ হচ্ছে পরপদ প্রধান আর বহুব্রীহি হচ্ছে অন্যপদ প্রধান। এবার একটু স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলেই বুঝা যায় যে, ‘বোটাখসা’ দিয়ে আসলে বোটা থেকে খসে (আলগা) গিয়েছে এমন কিছুকেই বুঝাচ্ছে। অর্থাৎ ‘খসা’ পদটির প্রাধান্য বিস্তার করছে অর্থাৎ পরপদ প্রধান। তাই আমরা এটাকে ৫মী তৎপুরুষ বলব।

অকেজো / অজানা : এই সমস্তপদদুটি পৃ. ৬৬ এ নঞ তৎপুরুষে এবং পৃ. ৬৮ এ নঞ বহুব্রীহিতে দেওয়া আছে। আবার পৃ. ৬৮ এ ‘অকেজো’ সমস্তপদটি প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহিতেও দেওয়া আছে। এবারে ব্যাখ্যায় আসা যাক। একটু আগেই বলেছি, তৎপুরুষ হচ্ছে পরপদ প্রধান আর বহুব্রীহি হচ্ছে অন্যপদ প্রধান।

এখন একটু চিন্তা করেন ‘অজানা’ দিয়ে কী বুঝায়? এর মানে জানা না। এখন কী জানা না তা কিন্তু স্পষ্ট না। অজানা শহর হতে পারে, অজানা মানুষ হতে পারে, অজানা পদ্ধতি হতে পারে। তাহলে ‘অজানা’ দিয়ে কী জানা না তা না বুঝিয়ে এটা বুঝাচ্ছে যে জানা না। অর্থাৎ পরপদ প্রধান। অকেজোর ব্যাপারটাও একই। তাই আমরা এগুলোকে নঞ তৎপুরুষ বলব।

ধামাধরা / ছাপোষা / পাচাটা : লক্ষ্য করুন, উপপদ তৎপুরুষ হচ্ছে পরপদ প্রধান আর বহুব্রীহি হচ্ছে অন্যপদ প্রধান। ধামা শব্দের আভিধানিক অর্থ ধান মাপার বড় ঝুড়ি। এখন কথা হচ্ছে ‘ধামাধরা’ অর্থ কী? এই বাগধারাটির অর্থ চাটুকারিতা যা অন্যপদ প্রধান অর্থাৎ বহুব্রীহি সমাস।

এরূপ – ছা-পোষা মানে ছেলে (পূর্বপদ) বা লালনপালন (পরপদ) করা না; ছা-পোষা মানে দরিদ্র ব্যক্তি। পা-চাটা মানে পা (পূর্বপদ) বা লেহন (পরপদ) করা না; পা-চাটা মানে হীনভাবে চাটুকারিতা করা। যেহেতু এগুলো সব অন্য পদ প্রধান সুতরাং এগুলোকে উপপদ তৎপুরুষ না বলে বহুব্রীহি বলাই শ্রেয়।

[ধারাবাহিকভাবে চলবে। আর একটা কথা, অনেক কষ্ট করে বই থেকে খুঁজে খুঁজে অভিধান অনুসারে পোস্টগুলো লেখি। তাই কপি না করে শেয়ার করলে বেশি খুশি হব। আর যদি কেউ কপি করতেই চান তাহলে অনুগ্রহ করে সংগৃহীত বা Collected না লিখে F. M. Shariyer Firoz নামটা লিখলে কৃতজ্ঞ থাকব।

এতে লেখকের কাজ করার আগ্রহ বাড়ে। যাই হোক শেয়ার করে সবার মাঝে তথ্যগুলো ছড়িয়ে দিন যেন আমাদের নিজেদের উদ্যোগেই আমাদের পাঠ্যপুস্তকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।]